হাওড়-পাহাড়ে এক দিন
ভ্রমণের স্থানঃ টেকেরঘাট- থানাঃ তাহেরপুর, জিলাঃ সুনামগঞ্জ।
প্রধান আকর্ষণঃ
# হাওড়ের মাঝখান দিয়ে স্পিড বোটে ও ট্রলারে করে যাত্রা
(বিঃদ্রঃ যারা সাতার জানেন না বা কম জানেন তারা সাথে তিন-চার প্লাস্টিকের খালি বোতল নিয়ে যেতে পারেন। এগুলো লাইফ জেকেটের কাজ করবে।এক দম ভয় করবেন না।ভয় করলে অনেক মিস করবেন।)
# পাহাড়, ঝর্ণা আর টেকেরঘাট মাইন লেক
(এটা এক সময় খনি ছিল। আর তা খুবই গভীর)
# এখানকার টাঙ্গুয়ার হাওড়ে রয়েছে হিজল বন। আরও অনেক কিছু গুগলে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন।
# এদিকে হাওড়গুলোতে খুব কম দামে মাছ পাওয়া যায়। তবে আনার জন্য বরফ আর বাক্স নিয়ে যেতে হবে।
আমাদের যাত্রার বিবরণঃ
ভোর পাঁচটায় লোকাল ট্রেনে উঠে বসি সিট পাবার আশায়। আমরা বসার দশ মিনিটের মধ্যে সব সিট ফিলাপ। ট্রেন ছাড়ে ছয়টায়। ট্রেনে বারহাট্টা পৌছি সকাল ৯:৩০ এর দিকে।ভাড়া ৩৫ টাকা করে।
হোটেলে রুটি-ভাজি-ডিমের নাশতা সেড়ে লেগুনাতে করে যাই গাছতলা বাজারে। খুব বাজে রাস্তা। ভাড়া নিয়েছিল ৪০ টাকা। যেতে সময়ও লেগেছিল অনেক। আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ যাত্রার একটি।
সেখান থেকে অটোতে করে যাই মধ্যনগর বাজার। ভাড়া ৩০ টাকা রাস্তা মোটামুটি ভাল। মধ্যনগর থেকে স্পিডবোটে করে যাই তাহের পুর। তখন একটা বাজে। ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ টাকা। সময় লাগে আনুমানিক ৪৫-৫০ মিনিট।
সেখান থেকে তাহের পুর বাজারের অপর পাশে টেকেরঘাট লঞ্চঘাটে যাই। সেখান থেকে রিজার্ভ করা স্যালো নৌকায় করে যাই টেকেরঘাট। ভাড়া নিয়েছিল ৬০০ টাকা।খুব সুন্দর যাত্রা। লোকটির ব্যবহারও ভাল লেগেছিল।
টেকেরঘাটের প্রধান আকর্ষণ হলো পাহাড় আর ছোট ছোট কিছু ঝর্ণা। তবে ভাগ্য খারাপ সব পাহাড়-এমনকি টিলাগুলোও ভারতের সীমানায়। এরমাঝে একটা মাত্র ছোট টিলায় উঠা নিরাপদ। টিলাটায় ভারত আর বাংলা দেশের সীমানা নির্ধারক দুটি পিলার আছে। একটি সিমেন্টের আর একটি লোহার। আর বাকি পাহাড়ে উঠা বেশ ঝুকি পূর্ণ। আমাদের সামনে মাত্র শখানেক গজ দুরে দুই বাঙালীকে পেটানোর দৃশ্য দেখেছি। কপাল ভাল তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিল।ভারতের সীমানার শুরু হওয়ার পর প্রায় আধাকিলোমিটার দূরে কাটাতারের বেড়া।কিছু পাগল তারপরও সীমানা পাড় হয়ে কাটা তারের বেড়া ডিঙাতে গিয়ে হাতের ছাল-চামড়া তুলে ফেলেছিল।তাই এক টিলার উপরেই যা করা করলে ভাল হয় আর পাহাড়ের সামনে দাড়ালে নিজের ক্ষুদ্রতা খুব ভাল করে বোঝা যায়। পাহাড়ের উপর বড় বড় পাথর। একটা গড়িয়ে পড়লে আমার মত দশজন চ্যাপ্টা হয়ে যাব।কাছ থেকে এ পাহাড় দেখার দৃশ্য আমার জীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতার একটি। আর পাহাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট ছোট প্রায় পঞ্চাশটি ঝর্ণা। আহ! কি ঠাণ্ডা পানি! একে বারে শরীর জুড়িয়ে যায়। এর মাঝে একটি ঝর্ণা মোটামুটি বড়। কেউ খুব বেশি আশা করবেন না যে, টিভিতে দেখা বিশাল ঝর্ণা এগুলো। আসলে পাথরের ফাক দিয়ে পানি বের হয়ে আসছে আর তা নালা আকারে প্রবাহিত হচ্ছে। একটি ঝর্ণা বিশাল এক লেকে পড়েছে আর তা উপচে হাওড়ে পড়ছে।তাতে গোসল করতে গিয়ে দুজন লোক প্রাণ হারিয়েছে। স্থানীয়রা তাই এখানে গোসল করতে ভয় পায়।
আমাদের দেখা দেখি কিছু যুবক নেমেছিল। বেশ মজা করে দাপাদাপি করলাম। মনেপড়ল শৈশব কৈশরের দিনগুলো। লেকে নৌকা ভ্রমন করা যায়। তবে বিশাল বিশাল হাওড় পাড় হয়ে যাওয়ার পর ওই লেকে (যদিও তা মোটামুটি বড়) নৌকায় চলতে আর মন চায়না।খাবার দাবারের মান মোটামুটি খারাপ আর দামও অনেক। ভাত, আলু ভর্তা আর ডাল দিয়ে খেতে লাগে চল্লিশ টাকা। অবশ্য ভাত পেট ভরে খাওয়ার সুযোগ আছে, যত প্লেটই লাগুক।
আসার সময় টেকেরঘাট থেকে সরাসরি কোন লঞ্চ বা নৌকা পাওয়া যায় না। যেতে হয় নতুন বাজার। আমরা একটা ছোট বোটে করে সেখানে যাই। নিয়েছিল ১০০ টাকা। তারপর সেখান থেকে আরেকটা বোটে আবার তাহের পুর। ভাড়া ৪০০ টাকা। আসর আর মাগরিবের নামায বোটেই পড়ি। প্রায় পৌনে আটটায় তাহের পুর থেকে স্পিড বোটে উঠি।রাতে স্পিডবোটে চড়া আমার কাছে বেশ ঝুকিপূর্ণ মনে হয়েছে। আমার এক সাথী সাতার জানতো না। বেশ ভয়ে ছিল বেচারা। এর মাঝে যখন হাওড়ের মাঝে স্পিড বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন সবাই আল্লাহ আল্লাহ করছিল। আর সিএনজির মত স্পিড বোট উল্টে যাওয়া রাতের বেলা কোন বড় ব্যাপার না। যাহোক ৩০০ টাকা ভাড়া দিলাম। মধ্যনগরে সময় লাগল এক ঘণ্টা বা কিছু বেশি।রাতের বেলার এ সফরটি ভালয় ভালয় শেষ হলো।মধ্যনগরে নেমে আরেক বিপদ কোন যানবাহন নেই। কয়েকটা হোন্ডা ভাড়া চায় অনেক বেশি। আমরা অবশেষে দুটো হোন্ডায় ছয় জন করে মোহনগঞ্জ আসি (ড্রাইভার ছাড়া)।
মোহনগঞ্জে টিকিট কাটলাম ইন্টারসিটি মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনের। ট্রেন ছাড়ার সময় সাড়ে এগারটা। আগের রাতে একফোটা ঘুমাইনি। তারপর টিলায় চড়া আর ঝরনার পানিতে দাপাদাপি তার পাশাপশি সাড়া দিনের সফরের ক্লান্তি। চোখ বুজে আসলেও শান্তিতে ঘুমোতে পারিনি ট্রেনে। আর সিট পেয়েছিলাম গৌরিপুর পর্যন্ত।ভাড়া পচাশি টাকা। তাই বাকি পথটুকু দাড়িয়ে আসতে হয়েছে। এই ট্রেনটি সরাসরি ঢাকা যায় ভোর বেলায় ঢাকার যাত্রীর এতে সফর করতে পারেন।শেষে ময়মনসিংহে পৌছি আড়াইটার দিকে। বাসায় এসেছিলাম সোয়া তিনটার দিকে।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন