আসুন আমরা তাঁর রঙে নিজেদের রাঙাই


আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চরিত্র মাধুর্য ছিল বর্ণনারও অতীত। সে অনুপম চরিত্রের বিবরণ সবচেয়ে সুন্দর করে ফুটে উঠে নিম্নের হাদিসটিতে। আসুন পান করি সেই অমিয় সুধা। বার বার পড়ি আর চিন্তা করি নিজেদের চরিত্রের কথা।এর মাঝে আছে সারা জাহানের মানুষের জন্য শিক্ষা।

ইমাম তিরমিযি তার শামায়েলে তিরমিযি কিতাবে হযরত হাসান রাদি. হতে বর্ণনা করেন,

হযরত হাসান  রাদি. বলেন,

আমি আমার পিতা হযরত আলী রা.কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাড়ির ভিতরের অবস্থা সমন্ধে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তখন তিনি বললেন, তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলে তার সময়কে তিন ভাগে ভাগ করতেন। এক ভাগ আল্লাহর জন্য, দ্বিতীয় ভাগ পরিবারস্থ লোকদের জন্য, আরেক ভাগ নিজের জন্য। তারপর আবার নিজের অংশকে নিজের মাঝে ও (পরিবারের বাহিরের) অন্যান্য মানুষের মধ্যে ভাগ করতেন। আর  (বাহিরের লোকদের জন্য নির্ধারিত সময়টিকে) বিশেষ লোকদের মাধ্যমে সর্ব সাধারনের জন্য ব্যয় করতেন। তিনি কোন (কল্যানকর) বস্তুকে (অন্যদের না দিয়ে নিজের জন্য) জমিয়ে রাখতেন না। সাক্ষাতের জন্য অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর অভ্যাস ছিল বিশেষ মর্যাদার অধিকারীদের প্রাধান্য দেয়া। আর তাদের সাক্ষাতের সময়ের পরিমান হত তাদের দ্বীনী মর্যাদার ভিত্তিতে। তাদের মাঝে কারও একটি প্রয়োজন থাকত, কারও একাধিক প্রয়োজন থাকত। তিনি তাদের নিয়ে মশগুল থাকতেন আর তাদের ব্যস্ত রাখতেন এমন কাজে যা তাদেরকে এবং উম্মতকে সংশোধিত করে। যেমন তাদের অবস্থা সমন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদেরকে বিভিন্ন বিষয় সমন্ধে জ্ঞানদান করা। আর তিনি বলতেন, উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিতদেরকে (আমার কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান সমন্ধে) জানায়। আমার কাছে যে ব্যক্তি তার প্রয়োজনের কথা পৌছাতে না পারে তাদের প্রয়োজনের কথা তোমরা আমার কাছে পৌছাও। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তির পদযুগলকে মজবুত করে দিবেন যে শাসকের কাছে এমন ব্যক্তির প্রয়োজনের কথা পৌছায় যে নিজের প্রয়োজনের কথা শাসক পর্যন্ত পৌছাতে পারে না। এসব ছাড়া তার কাছে আর কিছু আলোচনা করা হতো না আর কারো থেকে অন্য কিছু গ্রহণ করা হতো না। সবাই (কল্যাণের প্রতি) আগ্রহী হয়েই তার ঘরে প্রবেশ করতেন। আর তার কাছ থেকে পরিতৃপ্ত না হয়ে কেউ সেখান থেকে বের হতেন না। আর তারা প্রত্যেকে কল্যানের দিকে পথ প্রদর্শক হয়েই বের হতেন।

হাসান রাদি. বলেন, অতপর আমি তাঁর ঘরের বাহিরের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যে তিনি তখন কি করতেন। হযরত আলী রাদি. বললেন, তিনি শুধু এমন কথা বলতেন যা দরকারী ও উপকারী , যা সবার মাঝে ভালবাসা সৃষ্টি করত আর তাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করত না। তিনি সব গোত্রের সম্মানীদের সম্মান করতেন আর ‍তিনি সম্মানীদেরকেই গোত্রের শাসক ও নেতা বানাতেন। তিনি মানুষদের থেকে সতর্ক থাকতেন ও তাদের (ক্ষতি ও রূক্ষ আচরণকে) এড়িয়ে চলতেন, তবে তাদের কারও থেকে নিজের হাস্যোজ্জল মুখ  ফিরিয়ে রাখতেন না আর নিজের সুন্দর চরিত্রকে গুটিয়ে রাখতেন না। তিনি তাঁর মজলিসে অনুপস্থিত সাথীদের খোঁজ খবর নিতেন। লোকদের  বিভিন্ন বিষয়ে খবরা-খবর রাখতেন। সুন্দর ও ভালো জিনিসের প্রশংসা করতেন ও তাকে সমর্থন করতেন। আর মন্দ জিনিসের নিন্দা করতেন ও তার প্রতিরোধ করতেন। তিনি ছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ , ভারসাম্যহীন নয়।  তিনি কখনও অসতর্ক হতেন না এই ভয়ে যে তারা (ইবাদত থেকে) গাফেল হয়ে যাবে  অথবা (অধিক আমলের কারনে) বিরক্ত হয়ে যাবে। তিনি ছিলেন সর্বাবস্থায় সব (কঠিন) আমলের জন্য প্রস্তুত। কারও হক আদায় করতে গিয়ে কমও দিতেন না, বাড়াবাড়িও করতেন না। তার কাছাকাছি যারা থাকতেন তারা ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ । তার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হতেন তারাই যারা ছিল (মুসলমানদের প্রতি) কল্যাণকামী। তার কাছে সবচেয়ে  সম্মানিত ছিলেন তারাই যারা ছিলেন অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও সহযোগিতা প্রদর্শনকারী।

হাসান রাদি. বলেন, অতপর আমি তাঁর মজলিসের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম । হযরত আলী রাদি. বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর জিকির ছাড়া উঠা-বসা করতেন না। কোন মজলিসে গেলে যেখানে জায়গা পেতেন সেখানেই বসে পড়তেন। আর তাঁর সাথীদেরও এমন করতে আদেশ দিতেন। মজলিসের প্রত্যেককে যথাযত মূল্যায়ন করতেন। তাঁর মজলিসের সবাই মনে করতেন যেন, তার চেয়ে এই মজলিসের মধ্যে রাসুলুল্লাহ সা্ল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট তার চেয়ে সম্মানিত আর কেউ নাই। কোন ব্যক্তি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে বসলে অথবা কোন প্রয়োজনে আসলে  হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে বসে থাকতেন যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ব্যক্তি নিজে উঠতেন। তাঁর কাছে কেউ ‍কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই তা দিতেন, আর না দিতে পারলে কমপক্ষে কোন স্বান্তনামূলক কথা হলেও বলতেন। তাঁর দানশীলতা আর সুন্দর ব্যবহার ছিল সবার জন্য ব্যাপক। তাই তিনি সবার জন্য ছিলেন পিতার মত আর অধিকারের ব্যাপারে তাঁর কাছে সবাই ছিল সমান । তাঁর মজলিস ছিল জ্ঞান, সহনশীলতা, লজ্জা, আমানতদারী আর সবরের মজলিস। সেখানে উঁচু আওয়াজ বা হট্টগোল হতোনা আর কারো সম্মানহানী করা হতোনা, হতোনা কারো দোষচর্চা। সবাই ছিলেন বরাবর। বরং তাকওয়ার ক্ষেত্রে তার সঙ্গীরা একে অন্যকে ছাড়িয়ে যেতেন। তারা ছিলেন বিনয়ী। সে মজলিসে ছোটরা বড়দের সম্মান করতেন আর বড়রা ছোটদের স্নেহ করতেন। প্রত্যেকেই অভাবীদের প্রাধান্য দিতেন আর মুসাফিরদের (মেহমানদারী ও ) রক্ষনাবেক্ষণ করতেন।
 হে আল্লাহ তুমি আমাদেরও তোমার হাবীবের মত বানাও।


হাদিসটির মূল আরবী পাঠ নিম্মরূপঃ

عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ: سَأَلْتُ خَالِي هِنْدَ بْنَ أَبِي هَالَةَ، وَكَانَ وَصَّافًا عَنْ حِلْيَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَنَا أَشْتَهِي أَنْ يَصِفَ لِي مِنْهَا شَيْئًا، فَقَالَ: «كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَخْمًا مُفَخَّمًا، يَتَلَأْلَأُ وَجْهُهُ تَلَأْلُؤَ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ» فَذَكَرَ الْحَدِيثَ بِطُولِهِ قَالَ الْحَسَنُ: «فَكَتَّمْتُهَا الْحُسَيْنَ زَمَانًا، ثُمَّ حَدَّثْتُهُ فَوَجَدْتُهُ قَدْ سَبَقَنِي إِلَيْهِ. فَسَأَلَهُ عَمَّا سَأَلْتُهُ عَنْهُ وَوَجَدْتُهُ قَدْ سَأَلَ أَبَاهَا عَنْ مَدْخَلِهِ وَمَخْرَجِهِ وَشَكْلِهِ فَلَمْ يَدَعْ مِنْهُ شَيْئًا»

قَالَ الْحُسَيْنُ: فَسَأَلْتُ أَبِي، عَنْ دُخُولِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: كَانَ " إِذَا أَوَى إِلَى مَنْزلِهِ جَزَّأَ دُخُولَهُ ثَلَاثَةَ أَجْزَاءٍ، جُزْءًا لِلَّهِ، وَجُزْءًا لِأَهْلِهِ، وَجُزْءًا لِنَفْسِهِ، ثُمَّ جَزَّأَ جُزْأَهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّاسِ، فَيَرُدُّ ذَلِكَ بِالْخَاصَّةِ عَلَى الْعَامَّةِ، وَلَا يَدَّخِرُ عَنْهُمْ شَيْئًا، وَكَانَ مِنْ سِيرَتِهِ فِي جُزْءِ الْأُمَّةِ إِيثَارُ أَهْلِ الْفَضْلِ بِإِذْنِهِ وَقَسْمهِ عَلَى قَدْرِ فَضْلِهِمْ فِي الدِّينِ، فَمِنْهُمْ ذُو الْحَاجَةِ، وَمِنْهُمْ ذُو الْحَاجَتَيْنِ، وَمِنْهُمْ ذُو الْحَوَائِجِ، فَيَتَشَاغَلُ بِهِمْ وَيَشْغَلُهُمْ فِيمَا يُصْلِحُهُمْ وَالْأُمَّةَ مِنْ مُسَاءَلَتِهِمْ عَنْهُ وَإِخْبَارِهِمْ بِالَّذِي يَنْبَغِي لَهُمْ وَيَقُولُ: «لِيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ مِنْكُمُ الْغَائِبَ، وَأَبْلِغُونِي حَاجَةَ مَنْ لَا يَسْتَطِيعُ إِبْلَاغَهَا، فَإِنَّهُ مَنْ أَبْلَغَ سُلطَانًا حَاجَةَ مَنْ لَا يَسْتَطِيعُ إِبْلَاغَهَا ثَبَّتَ اللَّهُ قَدمَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» ، لَا يُذْكَرُ عِنْدَهُ إِلَا ذَلِكَ، وَلَا يُقْبَلُ مِنْ أَحَدٍ غَيْرِهِ، يَدْخُلُونَ رُوَّادًا وَلَا يَفْتَرِقُونَ إِلَا عَنْ ذَوَاقٍ، وَيُخْرِجُونَ أَدِلَّةً يَعْنِي عَلَى الْخَيْرِ

"قَالَ: فَسَأَلْتُهُ عَنْ مَخْرَجِهِ كَيْفَ يَصْنَعُ فِيهِ؟ قَالَ: «كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْرِنُ لِسَانُهُ إِلَا فِيمَا يَعْنِيهِ، وَيُؤَلِّفُهُمْ وَلَا يُنَفِّرُهُمْ، وَيُكْرِمُ كَرَيمَ كُلِّ قَوْمٍ وَيُوَلِّيهِ عَلَيْهِمْ، وَيُحَذِّرُ النَّاسَ وَيَحْتَرِسُ مِنْهُمْ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَطْوِيَ عَنْ أَحَدٍ مِنْهُمْ بِشْرَهُ وَخُلُقَهُ، وَيَتَفَقَّدُ أَصْحَابَهُ، وَيَسْأَلُ النَّاسَ عَمَّا فِي النَّاسِ، وَيُحَسِّنُ الْحَسَنَ وَيُقَوِّيهِ، وَيُقَبِّحُ الْقَبِيحَ وَيُوَهِّيهِ، مُعْتَدِلُ الْأَمْرِ غَيْرُ مُخْتَلِفٍ، لَا يَغْفُلُ مَخَافَةَ أَنْ يَغْفُلُوا أَوْ يَمِيلُوا، لِكُلِّ حَالٍ عِنْدَهُ عَتَادٌ، لَا يُقَصِّرُ عَنِ الْحَقِّ وَلَا يُجَاوِزُهُ. الَّذِينَ يَلُونَهُ مِنَ النَّاسِ خِيَارُهُمْ، أَفْضَلُهُمْ عِنْدَهُ أَعَمُّهُمْ نَصِيحَةً، وَأَعْظَمُهُمْ عِنْدَهُ مَنْزِلَةً أَحْسَنُهُمْ مُوَاسَاةً وَمُؤَازَرَةً»

قَالَ: فَسَأَلْتُهُ عَنْ مَجْلِسِهِ، فَقَالَ: «كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَقُومُ وَلَا يَجَلِسُ إِلَا عَلَى ذِكْرٍ، وَإِذَا انْتَهَى إِلَى قَوْمٍ جَلَسَ حَيْثُ يَنْتَهِي بِهِ الْمَجْلِسُ وَيَأْمُرُ بِذَلِكَ، يُعْطِي كُلَّ جُلَسَائِهِ بِنَصِيبِهِ، لَا يَحْسَبُ جَلِيسُهُ أَنَّ أَحَدًا أَكْرَمُ عَلَيْهِ مِنْهُ، مَنْ جَالَسَهُ أَوْ فَاوَضَهُ فِي حَاجَةٍ صَابَرَهُ حَتَّى يَكُونَ هُوَ الْمُنْصَرِفُ عَنْهُ، وَمَنْ سَأَلَهُ حَاجَةً لَمْ يَرُدَّهُ إِلَا بِهَا أَوْ بِمَيْسُورٍ مِنَ الْقَوْلِ، قَدْ وَسِعَ النَّاسَ بَسْطُهُ وَخُلُقُهُ، فَصَارَ لَهُمْ أَبًا وَصَارُوا عِنْدَهُ فِي الْحَقِّ سَوَاءً، مَجْلِسُهُ مَجْلِسُ عِلْمٍ وَحِلْمٍ وَحَيَاءٍ وَأَمَانَةٍ وَصَبْرٍ، لَا تُرْفَعُ فِيهِ الْأَصْوَاتُ وَلَا تُؤْبَنُ فِيهِ الْحُرَمُ، وَلَا تُثَنَّى فَلَتَاتُهُ مُتَعَادِلِينَ، بَلْ كَانُوا يَتَفَاضَلُونَ فِيهِ بِالتَّقْوَى، مُتَوَاضِعِينَ يُوقِّرُونَ فِيهِ الْكَبِيرَ وَيَرْحَمُونَ فِيهِ الصَّغِيرَ، وَيُؤْثِرُونَ ذَا الْحَاجَةِ وَيَحْفَظُونَ الْغَرِيبَ» رواه الترمذي في الشمائل
Share on Google Plus

About MIADAD

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.
    Blogger Comment

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন