অকুতভয় এক বীর সাহাবী

                                              
            আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রাদি)
মক্কার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মুসলিম- নতুন এক আসমানী ধর্মে দীক্ষিত। তারা এক আল্লাহ্তে বিশ্বাসী। তারা মূর্তিপূজা ঘৃণা করে। আর তাই আঁতে ঘা লেগেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বহু ঈশ্বরবাদী মূর্তিপূজারীদের। বছরের পর বছর ধরে অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে মুসলিমদের উপর। মূর্তিপূজাবিরোধী যে কোন কণ্ঠ রোধ করতে তারা বদ্ধপরিকর। কিন্তু তারা তিক্ততার সাথে লক্ষ্য করছে যে, মুসলিমদের সংখ্যা কমছে না, বরং বাড়ছে। এতে তাদের রাগ চক্রবৃদ্ধি হারে আরও বাড়ছে। নির্যাতনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে মরার দশা মুলমানদের । তবুও তাদের ইমান পাহাড়ের মতই অটল। আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সব দেখছেন। অসহায় মুসলিমদের সান্তনা দেয়া আর খোদার কাছে সাহায্য চাওয়া ছাড়া আর তিনি কি করতে পারেন ? অবশেষে মদীনায় হিজরতের অনুমতি হলো মুমিনদের। মদীনায় এসে তারা হাফ ছেড়ে বাঁচল।
কিন্তু না; ক’দিন না যেতেই তারা টের পেল তাদের জন্য অপেক্ষা করছে নতুন এক প্রতিপক্ষ, নতুন এক পরীক্ষা Ñ মদীনার ইহুদী সম্প্রদায়। যারা আগে মদীনার লোকদের তটস্থ রাখত শেষ নবীর আগমনের ভয় দেখিয়ে। আর দাবী করত তারাই হবে শেষনবীর খাস লোক। তারা নানা রকম মিথ্যা আর ধোঁকার আশ্রয় নিয়ে নিজেদের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখত। কিন্তু তারা দেখল শেষনবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্ম নিয়েছেন ইসমাঈলী বংশে। আর তিনি মদীনায় এসে উপস্থিত। তাদের নেতৃত্ব এবার হাতছাড়া হয়ে গেল প্রায়। তাই তারা উঠে পড়ে লাগল মুসলমানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আউস আর খাযরাজ গোত্রের তুলনায় তাদের সংখ্যা একে বারেই নগন্য। আর এ দুই গোত্র শেষনবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতে অজ্ঞান। সুতরাং সরাসরি কিছু করার উপায় নেই। তাই নানা কৌশলে মুসলমানদের কষ্ট দিতে লাগল। মানসিক ভাবে করতে চাইল বিপর্যস্ত। তারা প্রচার করতে লাগল, “আমরা জাদু করেছি। মুসলমানদের ঘরে আর কোন সন্তান জন্ম নিবে না।” সবাই শঙ্কা আর উৎকন্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে, আবু বকরের মেয়ে আসমা সন্তানসম্ভবা, দেখি কি হয় ? কুবা পল্লীতে আছে সে। তারপর একদিন আসল সেই শুভক্ষণ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ফুপাতো ভাই যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আর বন্ধুকণ্যা আসমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘর আলো করে আসল এক সন্তান, পিতা-মাতার মতই সৌভাগ্যশীল, ইতিহাসের পাতায় বহুল আলোচিত এক সিংহপুরুষ আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের। তার জন্মের সংবাদে মুসলমানদের মধ্যে বয়ে গেল আনন্দের জোয়ার। তাকবীর ধ্বনি দিয়ে তারা কাঁপিয়ে তুলল মদীনার আকাশ বাতাস। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, আল ইসতিআ’ব ফি মারেফাতিল আসহাব, উসদুল গাবাহ)
    নবজাতককে নিয়ে আসা হলো রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে। তিনি হযরত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন তার দু’কানে আযান-ইকামত দেয়ার জন্য।অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খেজুর চিবিয়ে দিলেন তার মুখে। কতই না সৌভাগ্যবাণ ছিল শিশুটি- তার পেটে সর্বপ্রথম যে জিনিসটি প্রবেশ করেছিল তা ছিল রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর লালা। তিনি তার নাম রাখলেন আব্দুল্লাহ।(সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, আল ইসতিআ’ব ফি মারেফাতিল আসহাব, উসদুল গাবাহ)
    মা-বাবার আদরে বড় হতে লাগলেন আব্দুল্লাহ। প্রায়ই যাতায়াত হতো খালা হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-র বাড়িতে। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাড়িতে, যিনি ছিলেন বাবার দিক থেকে চাচা আর মায়ের দিক থেকে খালু। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তিনি পেয়েছিলেন আট বছর চার মাস। সাত বছর বয়সে যুবায়ের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাকে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে নিয়ে আসেন বায়আ’ত হওয়ার জন্য। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে দেখে মুচকি হাসেন। অতঃপর বায়াত করে নেন। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, আল ইসতিআ’ব ফি মারেফাতিল আসহাব, উসদুল গাবাহ)
    শিশু আব্দুল্লাহ বড় হয়ে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তেত্রিশটি হাদিস বর্ণনা করেন, যা হাদিসের বিভিন্ন কিতাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বুখারী শরীফে তাঁর থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা সাতটি আর মুসলিম শরীফে রয়েছে তিনটি হাদিস। তিনি ছোট সাহাবাদের মধ্যে গন্য হতেন, যদিও তিনি ইলম-আমলে ছিলেন অনেক বড়। তিনি তার পিতা, নানা, মা, খালা, হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু), উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সহ অন্যান্যদের থেকেও হাদিস বর্ণনা করেন। আর বহু লোক তার থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে তার ভাই মদীনার বিখ্যাত ফকীহ উরওয়া ইবনে যুবায়ের, তার ভাতিজা হিশাম ইবনে উরওয়া, তাউস, আতা ইবনে আবী রাবাহ, ইবনে আবী মুলাইকা, ছাবিত বুনানী, আমর ইবনে দীনার, উবাইদা সালমানী বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা)
দশ বছর বয়সে ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় পিতার সাথে ময়দানে হাযির হয়েছিলেন। যুদ্ধ দেখে অন্যান্য শিশুদের মত তিনি ভীত হননি। বরং তাকে যুদ্ধের ময়দানে নেমে শত্রুর মোকাবেলা থেকে বিরত রাখতে যুবায়ের (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-র রীতিমত বেগ পেতে হয়েছিল। তাই তিনি আব্দুল্লাহকে একটি ঘোড়ার উপর বসিয়ে একজন পাহারাদার নিয়োগ করেন যাতে সে ময়দানে নামতে না পারে।(বুখারী, সিয়ারু আ’লামুন নুবালা)
পঁয়ত্রিশ হিজরীর ১৭ই জিলহজ হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শাহাদাত বরন করলেন। মুসলিম জাতির চরম দুর্দিন।পরস্পর ভুল বোঝাবুঝি আর মুনাফিকদের চক্রান্তে ছত্রিশ হিজরীর জুমাদাল উলা মাসে শুরু হলো জংগে জামাল। তিনি তার পিতার সাথে হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর পক্ষ অবলম্বন করেন। এক সময় তার পিতা স্বীয় ভুল বুঝতে পেরে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। কিন্তু তিনি নামাযরত অবস্থায় এক হতভাগার হাতে শাহাদাত বরন করেন। তখন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বয়স ছত্রিশ বছর। চল্লিশ হিজরীতে শাহাদাত বরন করলেন হযরত আলী ( রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
    এভাবে একে একে চলে গেলেন  হযরত তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু),আব্দুর রহমান বিন আউফ (রাদিয়াল্লাহু আনহু), হযরত মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)- সহ নেতৃস্থানীয় অনেক সাহাবী।
    হযরত মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) -এর ইন্তেকালের পর ইয়াযিদ খলীফার পদ গ্রহণ করেন। মক্কা, মদীনাসহ আরও বহু এলাকার লোকজন তাকে এ পদের উপযুক্ত মনেকরেননি। তাই তারা ইয়াযিদের বশ্যতাও স্বীকার করেননি। ফলশ্রুতিতে ঘটে যায় কারবালা ময়দানের বিয়োগান্তর ঘটনা।
    আর তাই ইয়াযিদ তৎকালীন খেলাফতের কেন্দ্র রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর শহরের লোকদের আগে শায়েস্তা করতে চাইল। মুসলিম ইবনে উকবা আল মুররী-কে পাঠালেন এক বিশাল বাহিনী দিয়ে। মদীনাবাসীরা গাসীলুল মালাইকাহ হানযালা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছেলে আব্দুল্লাহ বিন হানযালার নেতৃত্বে বের হয়ে আসল মদীনার পাশের প্রস্তরাকীর্ণ ভূমিতে যাকে আরবীতে বলা হয় হাররাহ। মুসলিম বিন উকবার বাহিনী সোনার মদীনাকে করলো ছিন্ন ভিন্ন।
                                                                  (চলবে)
Share on Google Plus

About MIADAD

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.
    Blogger Comment

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন